Monthly Archives: January 2014

জিয়াগঞ্জের সিংহের লোখন্ডওয়ালায় গর্জন

পার্ক প্লাজা হোটেলের রিসেপশনে প্রায় দেড় ঘণ্টা বসে থাকার পর পাঁচ তলার ঘর থেকে নীচে নামলেন তিনি। তাঁকে অনেকেই এই মুহূর্তে ভারতবর্ষের এক নম্বর প্লে-ব্যাক সিঙ্গার বলছেন। বন্ধু সঙ্গীত পরিচালকের কাছে আব্দার করলেন আরসালান-য়ের বিরিয়ানি খাবেন বলে। বিরিয়ানি আর চাঁপ অর্ডার দিয়ে প্রথমেই চমকে দিলেন…

Arijit Singh

রেকর্ডার অন করি তা হলে?
করুন। কিন্তু কী জানেন, আমার না ইন্টারভিউ দিতে একদম ভাল লাগে না। আমাকে ইন্দ্রদীপদা বলেছেন। আপনি ওঁর সঙ্গে এসেছেন বলে ইন্টারভিউ দিতে রাজি হলাম। ইন ফ্যাক্ট ইন্টারভিউ নয়, জাস্ট গল্প করি আমরা। সেটাই ভাল।

এত আপত্তি আপনার ইন্টারভিউ দিতে?
হ্যাঁ, হ্যা। আমার কাছে ইন্টারভিউ দেওয়াটা পয়েন্টলেস। আমি কাউকে ইন্টারভিউ দিই না তো! লাস্ট কবে দেখেছেন আমার ইন্টারভিউ? আমার ভালই লাগে না। ধুরর্…

এটা কি ফেমাস হওয়ার পর থেকে হল, না কি প্রথম থেকেই আপনি এমন?
প্রথম থেকেই তো আমি এ রকম। আগে ‘বোঝে না সে বোঝে না’-র সময় কিছু ইন্টারভিউ দিতে হয়েছিল। ‘আশিকি ২’-এর সময় মুকেশজির (মুকেশ ভট্ট) অনুরোধে বহু টিভি চ্যানেল আর রেডিয়ো স্টেশনে গিয়েছি। সবাইকে তো ‘না’ বলা যায় না। কিন্তু জোর করে করেছি। মন থেকে একদম নয়।

আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড তো এখন অনেকের জানা। আপনি মুর্শিদাবাদের ছেলে, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিখেছেন ছোটবেলা থেকে…
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। মুর্শিদাবাদ কিন্তু অনেক বড় জায়গা, ডিস্ট্রিক্ট। আমার জন্ম, বড় হয়ে ওঠা জিয়াগঞ্জ বলে একটা ছোট জায়গায়। খুব কালচারাল জায়গা জিয়াগঞ্জ। গানবাজনার দারুণ পরিবেশ। ওখানেই বড় হয়েছি আমি।

তখন কলকাতা আসতেন নিয়মিত?
আমি জিয়াগঞ্জে ক্ল্যাসিকাল শিখতাম বলে তখন কলকাতা আসতাম ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স শুনতে। একটা স্কলারশিপও পেয়েছিলাম। তখন ক্লাসিকাল মিউজিকের অনুষ্ঠানে ২০ মিনিটের ফিলার স্লটে গাইবার সুযোগ পেতাম। তখন আমি ওয়াইড আইড ফ্যান। আশেপাশে আমার আইডলদের দেখে কী মজাই না লাগত! রিম্পা শিব, আর্শাদ খান…

এখনও যান ক্ল্যাসিকাল কনসার্ট শুনতে?
আর সেই রকম কনসার্ট হয় কোথায় বলুন? আগে দু’মাসে একটা বড় শো তো হতই। রাশিদ খান অ্যান্ড শিবকুমার শর্মা এ রকম শো হলেই ছুটে চলে যেতাম। অনেক সময় রাতের পর রাত প্রোগ্রাম দেখেছি। কত সময় ঘুমিয়ে পড়েছি। মনে আছে সারারাত ব্যাপী এ রকম একটা প্রোগ্রামে আমার ঘুম ভেঙেছিল কুমার বোস-য়ের তবলার চাঁটিতে। তার পর অজয় চক্রবর্তী ভোর ভোর ভৈরবী শুরু করলেন… উফ্, কী থ্রিলিং সেই কনসার্টগুলো!

আজ যখন সবাই আপনাকে বলেন ইন্ডিয়ার নাম্বার ওয়ান প্লে-ব্যাক সিঙ্গার…
ধুর, কে বলে? যারা বলে, তারা জানে না এটা মিডিয়া হাইপ ছাড়া আর কিছু নয়। নিজের অ্যাকচুয়াল এবিলিটি নিজেই জাজ করতে পারি না, সেখানে মিডিয়া কী জাজ করবে! জাজমেন্টটা পুরোটাই আপেক্ষিক। আমি চেষ্টা করছি ভাল গাওয়ার। ইন ফ্যাক্ট, আমি চেষ্টাও করি না…

এটা কি সত্যি আপনি গান গাইতেই চান না…
আমি ক্রিয়েটিভ কাজ করতে চাই। গান গাওয়াটা আমার কাছে সেই ক্রিয়েটিভিটির একটা ধাপ শুধু। আর আমার এই ফরম্যাটে গান গাইতেই ভাল লাগে না। আমি নিজের জন্য গান গাইতে চাই।

কেন, এই প্লে-ব্যাক ফরম্যাটে ভুলটা কী? কেন গান গাইতে চান না আপনি?
আমি রিলেটই করতে পারি না। এখানে পুরো ব্যাপারটাই ফেক। আমি এটুকু বুঝে গিয়েছি, এখানে যদি আপনি মন থেকে প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হতে চান, তা হলে আপনি আর যাই হোক প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হতে পারবেন না। এখানে মিউজিক ডিরেক্টরদের ভাল সিঙ্গার দরকার নেই। কেউ যদি বলে আমি দারুণ সিঙ্গার, সে চান্স পাবে না। কিন্তু কেউ যদি বলে ‘আমার মনে হয় আমি পারব না। কিন্তু দেখি চেষ্টা করে, লেট মি ট্রাই’ সে চান্স পাবেই। কী ফেক, কী ফেক! বাপরে…আমার কষ্ট হয়।

কিন্তু ভাল না লাগলেও তো আপনি এই ‘প্লে-ব্যাক-য়ের পেপার’য়ে টপ মার্কস পেয়ে গিয়েছেন?
হ্যাঁ, পেয়েছি। কারণ আমি স্মার্ট তো! আমি তো পলিটিক্স-টা বুঝে গিয়েছি। সে বোধহয় আমি বাঙালি বলেই বুঝতে পেরেছি পলিটিক্স-টা।

আপনি নিজেকে বাঙালি ভাবতে ভালবাসেন?
বড় হয়েছি বাংলায়, আমি বাংলায় কথা বলি, বাংলায় চিন্তাভাবনা করি, আমার বাবা রবীন্দ্রসঙ্গীত গান। সে জন্যই আমি বাঙালি। এমনিতে আমি গুরুদ্বার যাই…

মানে আপনারা সর্দার?
হ্যাঁ, একদম সর্দার। আমার খুব অ্যাটাচমেন্টও আছে আমার ধর্মের সঙ্গে। ওই যে বললাম গুরুদ্বার যাই। লঙ্গরে খাবার পরিবেশন করি…

অনেকেই বলেন আপনি খুব অন্যমনস্ক। রাত ১১টায় অনায়াসে বেরিয়ে গিয়ে ভোর পাঁচটায় ফিরতে পারেন…
হ্যাঁ, পারি তো। ইচ্ছে করে আমার মাঝে মধ্যে এমন করতে। এটা কোনও ট্রেন্ড কী স্টাইল স্টেটমেন্ট নয়। আর আমার এই হ্যাবিটটা তৈরি হয়েছে মুম্বইয়ের জন্য। ওখানে রাতে আমি প্রায়ই বেরিয়ে যাই। ঘুরে বেড়াই একা একা লোখন্ডওয়ালায়।

তাই?
হ্যা। প্রথম প্রথম জানেন আমার কী অদ্ভুত লাগত! আমি গ্রামের ছেলে। আমাদের জিয়াগঞ্জে তো ১১টার সময় গভীর রাত। কোনও আলো জ্বলে না। কিন্তু মুম্বইতে গিয়ে দেখলাম রাত ১টাতেও লোখন্ডওয়ালা মার্কেটে আলো জ্বলজ্বল করছে। আমি শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম… আমার দারুণ লাগত… এত আলো…

মুম্বই গিয়েছিলেন তো প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হতেই?
তার আগে কলকাতাতেও কয়েকটা রিয়্যালিটি শো-তে চেষ্টা করেছিলাম। প্রতীক চৌধুরী একটা শো করতেন, নচিকেতা একটা শো করতেন। কিন্তু কিছু হয়নি। তার পর ‘ফেম গুরুকুল’-য়ে যাই।

সেখান থেকে মিউজিক প্রোগ্রামার কী করে হয়ে গেলেন?
আমাকে তো কেউ গান দিত না। তখন আমি রিয়্যালিটি শো থেকে ১০ লক্ষ টাকা পেয়েছিলাম। কিছু টাকা বাড়িতে দিয়ে বাকি টাকায় আমি প্রোগ্রামিংয়ের সেট আপ বানিয়ে ফেলি। একটা বাড়ি ভাড়া করি ১৪ হাজার টাকায়।

কোথায়?
লোখন্ডওয়ালায়। আমার সঙ্গে টিপস্-য়ের একটা কনট্র্যাক্ট ছিল। ওরা আমায় মাসে ৫০ হাজার টাকা দিত। আমার দিব্যি চলে যাচ্ছিল। প্রথম ব্রেক আমাকে দেন অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়। উনি তখন ‘এক্সট্রা টাইম’ প্রোগ্রামটা করছেন। ওটার টাইটেল মিউজিকটা বানাই। তার পর ধীরে ধীরে ‘দাদাগিরি’র ওপেনিং ট্র্যাকটা বানালাম। অনিলাভ একটা ছবি বানালেন ‘এগারো’ বলে। সেটার ব্যাকগ্রাউন্ডটা করলাম। সেটা অবশ্য জিয়াগঞ্জে বসেই বানিয়েছিলাম।

আপনি না কি কাজ না পেয়ে ২০০৮-এ কলকাতা ফিরে এসেছিলেন?
হ্যাঁ, ফিরে এসেছিলাম তো। আমি তো গান গাইতেই গিয়েছিলাম। কিন্তু কেউ তো গাওয়াত না! যতীন-ললিত এর ললিত-য়ের কাছে গিয়েছিলাম। কিছু হল না। একজন প্লে-ব্যাক সিঙ্গারের কত স্ট্রাগল থাকে! কোনও দিন ভুল করলে তার ভেতর ভেতর কত কষ্ট হয় সেটা শুধু সেই জানেন। নিজেকে সে তৈরি করে, কোনও লাইন বারবার গায় পারফেকশন আনার জন্য। সেগুলো করতাম মনে মনে। কিন্তু আমার তো নেক্সট টাইম-ই এল না!

খারাপ লাগত না?
খুব খারাপ লাগত। মাঝে মাঝে যখন টাকা শেষ হয়ে যেত, শঙ্কর-এহ্সান-লয়ের শঙ্কর ভাইয়ের কাছে চলে যেতাম। উনি আমাকে ছোট কত কাজ দিতেন। সেই কাজগুলো হয়তো কোনও দরকার লাগবে না তাঁর। কিন্তু আমাকে বলতেন: ‘তুই এটা করে দে। একটা চেক পেয়ে যাবি।’ হি হ্যাজ বিন আ গডফাদার।
আজ যখন আমি মিউজিক প্রোডিউসর হিসেবে কাজ করি, তখন কত প্লে-ব্যাক সিঙ্গার আমাকে নিজেদের গান দিয়ে যায়। ওদের দেখে আমার মনে হয় আরে, আমি নিজেই তো ওই জায়গায় ছিলাম কিছু বছর আগে। এবং বিশ্বাস করুন, যারা আসে তাদের মধ্যে কয়েকজন কিন্তু ফ্যাবিউলাস সিঙ্গার। কিন্তু কেউ চান্সই দেয় না তাদের।

কথা বলেন তাদের সঙ্গে?
কখনও কখনও বলি। সব সময় ইন্ডিভিজুয়ালি বলা হয় না। এটা বুঝতে পারি, বেচারিরা তো প্রিটেন্ড করতে পারে না। ম্যানিপুলেটিভ হতে পারছে না ওরা। তাই চান্স পাচ্ছে না।

প্রীতমের সঙ্গে কী ভাবে যোগাযোগ হল?
একদিন ভোর চারটেতে ফোন এল প্রীতমদার। বলল: ‘আমি তোর কম্পোজিশন শুনেছি। আমার মিউজিক অ্যারেঞ্জ কর।’ ব্যস, তার পর থেকেই জীবনটা বদলে গেল।

আচ্ছা, এটা কি সত্যি যে ‘বরফি’ ছবির সেই বিখ্যাত গান ‘ফির লে আয়া দিল’-য়ের স্ক্র্যাচ আপনি দশ মিনিটে বানিয়েছিলেন আর বিল্ডিংয়ের নীচে না কি অটো দাঁড়িয়ে ছিল?
হা হা হা…কে বলল?

সেটা জেনে কী হবে, বলুন না কী হয়েছিল?
(হেসে) সে দিন প্রীতমদা অন্য একটা কাজ করছিলেন। আমাকে বললেন ‘ফির লে আয়া দিল’-য়ের স্ক্র্যাচ তৈরি করে অনুরাগদাকে শোনাতে। সে দিন আবার আমি একটা অ্যানিমেশন ছবি দেখার জন্য টিকিট কেটেছি। অটোও দাঁড়িয়ে রয়েছে নীচে। হাতে ঠিক দশ মিনিট সময় ছিল। আমি হারমোনিয়ামটা বের করে পাঁচ মিনিটে গানটা গাই। পাঁচ মিনিটে কিছু সাউন্ড অ্যাড করি। বাকিটা ভেবেছিলাম রাতে এসে ফাইনাল করব। কিন্তু পরে দেখলাম ওই দশ মিনিটে বানানো স্ক্র্যাচটাই ফাইনাল এডিটে থেকে গিয়েছে। তার পর বাকিটা তো সবাই জানেন…

সাকসেসের পথটা তো বোঝা গেল। কিন্তু এ রকম এম এস ধোনি কবে থেকে হয়ে উঠলেন?
মানে?

মানে, এই যে ফোন ধরেন না দিনের পর দিন…
হা হা হা। আমার ফোন ধরতে ভালই লাগে না। আমার অ্যালার্জি আছে টেলিফোনের প্রতি। বেশির ভাগ সময় ফোনটা উল্টোনো অবস্থাতেই থাকে। তাই কে ফোন করল, বেশির ভাগ সময় জানতেই পারি না।

আপনার বাবাও নাকি মাঝে মধ্যে আপনাকে ফোনে ধরতে না পেরে আপনার বন্ধুবান্ধবদের ফোন করেন?
সেটা হয়েছে মাঝে মধ্যে। কিন্তু কিছু কিছু নাম্বার আমার সেভ করা আছে, সেই ফোনগুলো তুলি।

ফোনে এত অ্যালার্জি বলছেন, অথচ ব্যবহার করছেন দারুণ একটা ফোন!
ওটা আমি কিনিওনি। আমাকে এক অস্ট্রেলিয়ান গিফ্ট করেছেন। হোয়াটস্অ্যাপ আছে, ওটা ব্যবহার করি। আর গেমস্ খেলি খুব। ব্যস।

আচ্ছা এ বার একটু অন্য জোনে ঢুকি। বেশ কয়েক দিন ধরেই শুনছি এই সাকসেস দেখে নাকি আপনার মাথা ঘুরে গিয়েছে।
(বেশ রেগে) মানে?

মানে আপনি নাকি সময়মতো শো-তে আসেন না। ফোন ধরেন না। শো অর্গানাইজারদের কথা শোনেন না ।
ধুর। কী এসে গেল শো অর্গানাইজার কী বলল তাতে? ধরুন আমি ছবি আঁকছি, সেই সময় একটা ফোন এল। আমি ফোনটা ধরবই না। কারণ তখন ছবি আঁকাটাই আমার প্রায়োরিটি। হয়তো কিছু লিখছি, এমন সময় কোনও মিটিংয়ের সময় এগিয়ে আসছে। তখনও কিন্তু আমার কাছে লেখাটাই বেশি ইম্পর্ট্যান্ট ওই মিটিং থেকে।

আর লেট করে আসাটা?
(হেসে) ওটা আমার ছোটবেলা থেকে। কত দিন ছবি আঁকতে আঁকতে ভুলেই গিয়েছি স্কুলের টাইম। প্রীতমদার কাছেও দেরি করে পৌঁছই। এটা আমার রেগুলার হ্যাবিট, আমার কাছের মানুষরা সেটা জানেন…

আপনার কথা শুনে মনে হয় কোথাও আপনি জিয়াগঞ্জের সেই ছেলেটা যে শহুরে জীবনে এসে হারিয়ে গিয়েছে। এই সব ফাইভ স্টার হোটেলে সে বেমানান।
সত্যি বেমানান। আমি রিলেটও করতে পারি না। এই হোটেলের ঘর। এই ওয়েটার… এ সব আমার ভালই লাগে না। কষ্ট হয়। আমার রুটেড মানুষ পছন্দ জানেন। যাদের শেকড়টা খুব শক্ত। যে জন্য আমার ইন্দ্রদীপদাকে খুব ভাল লাগে। কে ওকে নিয়ে কী ভাবল তা নিয়ে ও বদার্ড নয়।

আচ্ছা, এই যে এত শো করছেন…
কোথায় শো করছি? আমি বেছে বেছে শো করি। আমার ম্যানেজার আমাকে বলেছে মুম্বইতে বাড়ি কিনতে হলে আমার আরও শো করা উচিত। কিন্তু মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর আমি শো করছি না। ভালই লাগে না আমার শো করতে। লোকেরাও কী রকম, আমার গান প্রথমে সিনেমায় শুনছে, টিভিতে শুনছে, এমপি থ্রি-তে শুনছে… আবার পয়সা খরচ করে শো-তেও শুনছে। অদ্ভুত লাগে… ইনফ্যাক্ট ভাল লাগে না।

শো-তে আপনার রেমুনারেশনও তো প্রচুর?
হ্যাঁ। কিন্তু আমার কাছে টাকা বেশি থাকে না। আমি জানি অ্যাকাউন্টে আছে, কিন্তু টাকাপয়সা সামলায় আমার ম্যানেজার। আর সত্যি এত টাকা নিয়ে কী করব? মাঝে মধ্যে আমারই অবাক লাগে! আমি ডিজার্ভও করি না। (হেসে) এটা বাঁদরের গলায় মুক্তোর মালার মতো। অত টাকা নিয়ে কী হবে?

আজ আপনার এত নাম, এত ফেম, এত পয়সা। জিয়াগঞ্জে গেলে বন্ধুরা কী বলে?
জিয়াগঞ্জে গেলে এখনও আমাকে দেখতে পাবেন চায়ের দোকানে ঠেক মারতে। আমার বন্ধুরা বলে, ‘তোর এত নাম হবে আমরা বুঝতেই পারিনি।’ খুব হাসি আমরা সবাই মিলে।

গাড়ি কিনেছেন শুনলাম।
হ্যাঁ, একটা নিসান মাইক্রা কিনেছি।

ভারতের এক নম্বর গায়ক ‘সিডান’ না কিনে ছোট গাড়িতে যাতায়াত করে?
আরে প্রীতম চক্রবর্তী যদি ছ’বছর স্যান্ট্রো চড়তে পারে, তা হলে আমার ছোট গাড়ি তো ঠিকই আছে। তবে কলকাতায় একটা জিনিস মিস করি।

কী সেটা?
মেট্রো চড়া।

মেট্রো চড়তেন?
হ্যাঁ, হ্যা। ওটাই তো বেস্ট ওয়ে অব ট্রান্সপোর্ট। আমার ট্রেন, মেট্রো দারুণ লাগে। ট্যাক্সি কী বাসে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। ওই যখন শিয়ালদা’ স্টেশনে আসতাম, তখন ওই গরম ট্যাক্সি, ধোঁয়া… আমার মাথা ধরে যেত।

এ বার বলুন আগামী দু’বছর অরিজিৎ সিংহের কী প্ল্যান?
আমি ছবি বানাতে চাই।

মানে, ছবির পরিচালনা?
হ্যাঁ।

হিন্দি ছবি না বাংলা?
যে কোনও ভাষাতেই হতে পারে। কিন্তু পরিচালনায় আসতে চাই। ফিল্ম বানানোর ব্যাপারটা অসম্ভব ক্রিয়েটিভ লাগে।

আচ্ছা, আপনার আইপডে কী গান থাকে?
আইপডে থাকে রাশিদ খানের বন্দিশ। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। জন মেয়ার। হৈমন্তী শুক্ল। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকে। আবার রিহানাও পাবেন।

এ তো ভ্যারিড কমপাইলেশন?
হ্যাঁ, সব রকম গান শুনি। তা ছাড়া কিশোরকুমারের অন্ধ ভক্ত। কিশোরকুমার, মান্না দে আর লতা মঙ্গেশকর। কিন্তু কেউ যদি আমাকে বলে একটা হলে লতা মঙ্গেশকর গাইছেন আর অন্য হলে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার কনসার্ট হচ্ছে, আমি কিন্তু চৌরাসিয়া শুনতেই যাব। আর একটা জিনিস আছে।

কী?
একজনের গানের সঙ্গে আমি রবিবারকে অ্যাসোসিয়েট করি। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। রবিবার মানে আমার কাছে চুল কাটতে যাওয়া। চুল কেটে ফিরছি, বাড়িতে পাঁঠার মাংস রান্না হচ্ছে আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান বাজছে। আমার কাছে রবিবার মানে এটা।

আচ্ছা অনেকেই বলে আপনি নাকি খুব রগচটা?
না, না, আমি রগচটা নই একদম। কে আমার নামে কী বলল, কেন বলল এ সব নিয়ে আমি কেয়ারই করি না। তবে এই না যে আমি কারও কথা শুনি না।
যারা সত্যি কথা বলে, তাদের কথা শুনি। তারা যদি বলে আমি কোথাও ভুল করেছি এবং আমারও যদি মনে হয় তারা ঠিকই বলছে, তা হলে আমি তাদের কথা অবশ্যই শুনি। এই তো সেদিন একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লাম এক সাংবাদিকের সঙ্গে…

সেই প্রসঙ্গটা ভাবছিলাম তুলব কি না?
না, না, কী এসে যায়? আমি ও সব ডিপ্লোম্যাটিক ‘নো কমেন্টস’য়ে বিশ্বাস করি না। আমি ভাই গ্রামের ছেলে। আমার যদি কিছু পছন্দ না হয়, তা হলে আমি হাত চালাব। মারব। আমার গ্রামে বন্ধুবান্ধব হচ্ছে মাঝি, ধোপা, মেথর। আমরা অত ডিপ্লোম্যাসি বুঝি না। খারাপ লাগলে মুখের ওপর বলে দিই।

তা কী করেছিল সেই সাংবাদিক?
আরে সাংবাদিক তো পরে। আমার পাড়ার লোক, বাচ্চুদা। হঠাৎ করে দেখি আমাকে ট্যারাবাঁকা প্রশ্ন করছে। আমি ওঁকে বললামও, বাচ্চুদা, কেন এমন প্রশ্ন করছ, ছাড়ো না। কিন্তু শুনল না।

ওঁর বক্তব্য কী ছিল?
আরে উনি আমাকে বোঝাতে চাইছিলেন ওঁরা পাশে ছিলেন বলেই না কি আজকে আমি অরিজিৎ সিংহ হয়েছি। ওঁরাই নাকি আমাকে বানিয়েছেন। ঘোড়ার মাথা! ওঁদের জন্য নাকি আমি এখানে পৌঁছেছি! আমি নিজেই এখনও পৌঁছতে পারিনি যেখানে পৌঁছতে চাই, ওঁরা নাকি পৌঁছিয়েছেন। বিরক্ত লাগে।

আচ্ছা সোনু নিগমের মতো গায়ক মুম্বইতে কাজ পাচ্ছেন না, এটা ভেবে খারাপ লাগে না?
অসম্ভব খারাপ লাগে। আই ফিল টেরিবল। আমি সোনু নিগমের বিরাট ফ্যান।

সোনু নিগম যে রয়্যালটি নিয়ে এত আন্দোলন করছেন, সে বিষয়ে আপনার কী মত?
রয়্যালটির প্রশ্ন কেন করছেন বলুন তো? ও সব ফালতু জিনিস। রয়্যালটি দিতে হলে মিউজিশিয়ানদের দেওয়া হচ্ছে না কেন? মিউজিশিয়ানরা কত কন্ট্রিবিউট করে একটা গানে, তা তো আমরা গায়করা জানি। তাদের রয়্যালটি দিতে হবে এই নিয়ে তো কখনও কোনও আন্দোলন হয় না। ফালতু যত সব।

থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য ইন্টারভিউ অরিজিৎ…
থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। (হেসে) অনেক কথা হল। এ বার বিরিয়ানি খেতে যাব। ব্যস, এই বছরের জন্য আমার ইন্টারভিউ দেওয়ার কোটা শেষ।

Source: http://www.anandabazar.com/archive/1140110/10ananda-plus1.html